চিড়িয়াখানা
কাকে বলে তা আমরা সবাই জানি। সেখানে বিশ্বের নানা রকম জন্তু-জানোয়ার, পশু-পাখি,
মাছ ইত্যাদি ধরে রাখা হয়। চিড়িয়াখানায় না গেলে পশু-পাখি সম্পর্কে জানা যায় না।
অনেক রকম পশু, পাখি, মাছ ইত্যাদি নিয়ে ১১৫০ সালে চীনের এক রাজা নিজের জন্য একটি
চিড়িয়াখানা স্থাপন করেন, যেখানে অন্য রাজারা আর সভাসদরা যেতে পারতেন। সেকালের
রাজা-বাদশাহরা নিজেদের শখের জন্য চিড়িয়াখানা রাখতেন। অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা শহরে এখনও
এমন একটি চিড়িয়াখানা টিকে আছে।
১৭৯৩ সালে প্যারিসে প্রথম জনসাধারণের জন্য একটি
চিড়িয়াখানা খোলা হয় যার সঙ্গে একটি মিউজিয়াম আর একটি বোটানিক্যাল গার্ডেন ছিল।
তারপর ইউরোপে একের পর এক চিড়িয়াখানা খোলা হয়। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে
পাঁচশোরও বেশি চিড়িয়াখানা রয়েছে। পশ্চিম বার্লিনের চিড়িয়াখানা এত বিশাল যে সেখানে
রয়েছে তের হাজার রকমের জীব-জন্তু। আমাদের দেশের জাতীয় চিড়িয়াখানা হচ্ছে ঢাকার
মিরপুরে। এছাড়া আমাদের দেশের বিভিন্ন স্থানে রয়েছে ছোট-বড় হরেক রকমের চিড়িয়াখানা।
ছবিতে
মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে দুটি পশু। দেখতে অনেকটা ঘোড়ার মতো, কিন্তু ঘোড়ার গায়ে কি
অমন ডোরাকাটা দাগ থাকে? থাকে না। তাই ধরন-ধারণে আর সাইজে ঘোড়ার মতো দেখতে হলেও ঐ
পশু দুটি ঘোড়া নয়। আশ্চর্য সুন্দর এই পশুর নাম জেব্রা। এদের সারা শরীর জুড়ে
চমত্কার সাদা-কালো ডোরাকাটা, যেন কোনো দক্ষ শিল্পী তার নিপুণ তুলির আঁচড়ে
নিখুঁতভাবে ছবি এঁকেছেন!
জন্মগতভাবে প্রতিটি জেব্রা তার শরীরে এই চমত্কার ডোরাকাটা সৌন্দর্য পায়। তবে এটা
কি শুধু সৌন্দর্য, নাকি এই ডোরার অন্য কোনো রহস্য আছে? এ প্রশ্ন বিজ্ঞানীদের সামনে
এসেছে বহু আগে থেকেই। কিন্তু একশতভাগ উত্তর মেলেনি এখনও। জীববিজ্ঞানীরা গভীরভাবে
পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা করে ডোরা-রহস্যের জট খোলার চেষ্টা করেছেন। তাদের গবেষণায়
বেরিয়ে এসেছে এক বিস্ময়কর তথ্য। বিজ্ঞানের কল্যাণে আমরা জানি, জীবজন্তু-গাছপালা
ইত্যাদি শত্রুর আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষার জন্য প্রকৃতিগতভাবেই যার যার উপযোগী
সুরক্ষা তৈরি করে নিতে পারে। জেব্রার ক্ষেত্রেও এটি সত্য। জেব্রার শরীরের চমত্কার
দাগগুলো নিছক সৌন্দর্যের উপকরণ নয়; আসলে তা তার জীবন বাঁচানোর প্রাকৃতিক ঢাল—এক
বিশ্বস্ত সুরক্ষা। জেব্রাদের জন্মভূমি হলো আফ্রিকা। সেই আফ্রিকার সিংহও আবার
জগিবখ্যাত। আর জেব্রাদের প্রধান শত্রু বা ঘাতক এই সিংহরা তাদের খাওয়ার জন্য
সবসময়ই তক্কে তক্কে থাকে। অন্যদিকে জেব্রারাও সে-ব্যাপারে সচেতন থেকে সমতল
তৃণভূমিতে বিচরণ করে। এ সময় এক চমত্কার প্রাকৃতিক ম্যাজিক তৈরি হয়। জেব্রার
শরীরের মোটা-মোটা ঢেউ-খেলানো ডোরাকাটা শাদা-কালো দাগগুলো সমতল তৃণভূমির বাদামি বা
সবুজ ঘাসগুলোর সাথে একাকার হয়ে যায়। সিংহ তখন সেই ঘাসের অরণ্যে জেব্রাকে আর
আলাদাভাবে শনাক্ত বা চিহ্নিত করতে পারে না। ফলে তৃণভূমির ঘাসই কি আর জেব্রাই বা
কি-স-ব তার কাছে একাকার মনে হয়। তাই সে ঘাসের মধ্যে জেব্রাকে আলাদাভাবে চিনতেও
পারে না, শিকার করে খেতেও পারে না— ডোরাকাটা ডিজাইনের জাদুই তাকে বাঁচিয়ে দেয়
ভয়ংকর খাদক সিংহের হাত থেকে।
প্রশ্ন উঠতে পারে, জেব্রারা ঘাসের সমতল ভূমিতে যখন দলবদ্ধভাবে বিচরণ করে, তখন
সিংহরা জেব্রার পালে ঝাঁপিয়ে পড়ে না কেন? বড় একপাল জেব্রাও কি তাদের চোখে পড়বে
না? এখানেও সেই একই ম্যাজিক, তবে একটু ভিন্নভাবে। জেব্রারা দলবদ্ধভাবে একে অপরের
একেবারে কাছাকাছি অবস্থান করে। এতে কী হয়? হ্যাঁ, এ সময়ও এক চমত্কার প্রাকৃতিক
সুরক্ষা বা ঢাল তৈরি হয়। জেব্রাগুলো একেবারে কাছাকাছি অবস্থানের কারণে দূর থেকে
মনে হয়, কোনো কিছু বোধহয় গাদা করে রাখা হয়েছে, অথবা মনে হয় নিরেট কোনো উঁচু সমতল
ঢিবি। অনেকগুলো জীবন্ত জেব্রা যে একসাথে অবস্থান করছে, পশুরাজ সিংহরা তা বুঝতেই
পারে না! জেব্রাদের এই ‘ক্যামোফ্লেজ’ বা ছদ্মাবরণ সিংহদের চোখে বিভ্রম তৈরি করে;
আর তার ফলে ঘাতকের হাত থেকে বেঁচে যায় অপূর্ব সুন্দর এই প্রাণীগুলো।
(সূত্র: ইন্টারনেট)
Next Page